করোনা সংকটে বেতন-বোনাস পাচ্ছেন না সিলেটের অধিকাংশ স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকরা

মাসুদ আহমদ রনিঃ করোনা সংকটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও দুমাস ধরে বেতন ভাতা পাচ্ছেন না সিলেটের অধিকাংশ স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকরা। এমনকি ঈদের সময় ন্যায্য সম্মানী ও উৎসব বোনাস পাওয়া থেকেও বঞ্চিত অনেকে। যারা শুধুমাত্র স্থানীয় দৈনিকে কাজ করেন, তারা এই ঈদে পরিবার পরিজন নিয়ে অর্থনৈতিক বিপাকে রয়েছেন। 

করোনা পরিস্থিতির কারণে পত্রিকাগুলোর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পত্রিকার একমাত্র আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন প্রকাশও বন্ধ হয়ে যায়। যে কারণে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে পত্রিকাগুলো। এদিকে, প্রকাশনা বন্ধ থাকলেও অধিকাংশ পত্রিকারই চালু আছে অনলাইন সংস্করণ। ফলে সাংবাদিকদের কাজ থেমে নেই। অফিসে না গেলেও তারা নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছেন। কিন্তু আয় বন্ধের অজুহাতে অনেক পত্রিকাই তাদের কর্মীদের বেতন ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান অর্ধেক বেতন দিয়ে কর্মীদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান দৈনিক সিলেটের ডাকে গত মার্চ মাস পর্যন্ত বেতন ভাতা পরিশোধ স্বাভাবিক ছিলো। এপ্রিল মাসে কর্মীদের অর্ধেক বেতন দেয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে ঈদ বোনাস দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বাজেট অনুমোদন করেছেন বলে জানা গেছে। প্রতি বছর ১০০% বোনাস দেয়া হলেও এবার পরিস্থিতির কারণে কিছুটা কম দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।তবে, ঈদের পর পত্রিকার প্রকাশনা পুণরায় চালু হলে কর্মীদের সব পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন এই কর্মকর্তা।বেতন ভাতা পরিশোধে সিলেটের ডাক এর একটা ইতিবাচক ঐতিহ্য রয়েছে। এ পত্রিকার সাবেক একাধিক সংবাদকর্মী জানান, সিলেটের ডাকে প্রতিমাসের প্রথম কার্যদিবসে বিগত মাসের বেতন ভাতা পরিশোধের রেওয়াজ চালু ছিলো দীর্ঘদিন। দূ্র্যোগে- সংকটেও এ রেওয়াজের ব্যত্যয় হয়নি কখনও। এমনকি গতবছর আইনী জটিলতায় এ পত্রিকার প্রকাশনা ৬ মাস বন্ধ থাকাকালেও কর্মীদের বেতন ভাতা বন্ধ করেনি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মাত্র দুমাস আয় বন্ধ থাকায় কর্মিদের বেতন  ভাতা পরিশোধে ব্যত্যয় হওয়াকে দূর্ভাগ্যজনক বলছেন সাংবাদিকরা।এ বিষয়ে সিলেটের ডাক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান এর মোবাইলে বার বার কল করা হলেও তিনি কল ধরেননি। উল্লেখ্য, বিশিষ্ট শিল্পপতি রাগিব আলী এ পত্রিকার মালিক।

দৈনিক উত্তরপূর্ব পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে অনেকেরই ৩/৪ মাসের বেতন ভাতা বকেয়া পড়েছে। ঈদ উপলক্ষে কর্তৃপক্ষ বকেয়া পরিশোধের জন্য একটা থোক বরাদ্দ দিয়েছেন। দুয়েকদিনের মধ্যে তা বন্টন করার কথা রয়েছে। বরাদ্দকৃত টাকায় পুরোপুরি বকেয়া পরিশোধ এবং ঈদ বোনাস প্রদান সম্ভব না হলেও ঈদে কর্মীদের খালিহাতে বাড়ি যেতে হবে না বলে মনে করছেন কর্মরত সাংবাদিকরা।আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল এ পত্রিকার মালিক- সম্পাদক।

এদিকে, দৈনিক জালালাবাদে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে গত মার্চ মাসে সর্বশেষ কর্মীদের বেতন দেয়া হয়েছিলো। এপ্রিল মাসের বেতন এখনও দেয়া হয়নি। আর চলতি মে মাস শেষ হতে চললেও বেতন ভাতা কিংবা ঈদ বোনাস দেয়ার কোন আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এনিয়ে হতাশায় আছেন সাংবাদিক, কর্মচারীরা। এদিকে, বেতন ভাতা পরিশোধে অনিয়ম থাকলেও কথায় কথায় সাংবাদিকদের চাকুরিচ্যুতি, হুমকি-ধমকি থেমে নেই এ পত্রিকায়। চলতি সংকটকালেও একটি সংবাদ প্রচারকে কেন্দ্র করে জনৈক রিপোর্টারকে ফেসবুকে প্রকাশ্য ঘোষনা দিয়ে বরখাস্ত করেন পত্রিকাটির সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর। অবশ্য সোস্যাল মিডিয়ায় তুমুল সমালোচনার মুখে সম্পাদক পরে ওই পোস্ট মুছে ফেলেন। এর কিছুদিন আগেই পর্যায়ক্রমে পত্রিকাটির একজন নির্বাহী সম্পাদক ও কয়েকজন রিপোর্টার চাকুরিচ্যুত হন। জালালাবাদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সিইও নূরুল ইসলাম বাবুল সিলেট ওয়াচকে জানান, পত্রিকার আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মীদের বেতন ভাতা পরিশোধ স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। তবে ঈদ উপলক্ষে দুয়েকদিনের মধ্যে কিছু বকেয়া পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
বাজারে উল্লেখযোগ্য কাটতি না থাকলেও দৈনিক কাজিরবাজার কর্তৃপক্ষ এ সংকটকালেও তাদের কর্মীদের বেতন ভাতা পরিশোধ স্বাভাবিক রেখেছে বলে জানা গেছে। দৈনিক সিলেট বাণী, শ্যামল সিলেট,শুভ প্রতিদিন, সবুজ সিলেটসহ আরো কয়েকটি স্থানীয় দৈনিকে সাংবাদিক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা সবসময়ই অনিয়মিত। এই করোনাকালেও তারা একই ধারা বজায় রেখেছে বলে জানা গেছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব পত্রিকার সাংবাদিকরা সহযোগী অন্য পেশার উপার্জন দিয়ে সংসার চালালেও বর্তমান লকডাউন পরিস্থিতিতে তারা পড়েছেন নজিরবিহীন অর্থ সংকটে।
সাংবাদিকদের এ দূরাবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে সিলেট প্রেসক্লাব চলতি রমজানের শুরুতে সদস্যদের একটি বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে প্রেসক্লাব সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, আঞ্চলিক সাংবাদিকরা এমনিতেই আইনী কাঠামো অনুযায়ী যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা তা থেকে বঞ্চিত। তারপরও যেটুকু বেতন ভাতা তারা পান তার উপর তাদের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। এই বিপদের সময় পত্রিকার মালিকদের একটু বাড়তি চাপ নিয়ে হলেও সাংবাদিকদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।