গাজীনগর জামে মসজিদটি বয়ে চলেছে ঐতিহ্যের স্মারক

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ ক্রমাগত বিলুপ্ত হতে চলেছে কালের ঐতিহ্য। কিছু কিছু স্থাপনা ছাড়া এখন আর খুব একটা ইতিহাস রক্ষাকারী কিংবা ঐতিহ্যবাহী জিনিস আমাদের চোখে পড়েনা। এ যেনো মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় যুক্ত না হয়ে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গাজীনগর জামে মসজিদ। সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের মদনপুর (দিরাই রাস্তা মুখ) থেকে দিরাই যাওয়ার রাস্তায় গাজীনগর গ্রামের উত্তরপাশে রাস্তার পাশ ঘেঁষে আপন ঐতিহ্যের গড়িমায় উদ্ভাসিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই মসজিদটি। চলাচলের সময় রাস্তা থেকে যে কোনও মানুষের দৃষ্টি কাড়ে বিশালাকার তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদ। গাঢ় সবুজ রঙের মসজিদের এই তিনটি গম্বুজই মোঘল নকশার নকশার কথা মনে করিয়ে দেয় প্রতিনিয়ত। একতলা বিশিষ্ট এই মসজিদটি ভাষা আন্দোলনের ছয় বছর পর ১৯৫৮ সালে নির্মাণ করেন গাজীনগর গ্রামবাসী। রাস্তার পাশে সত্তর শতাংশেরও বেশি জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ, ঈদগাহ, বিশাল পুকুর আর ইমাম-মুয়াজ্জিন থাকার জন্য আলাদা ঘর। পুরোটা জায়গাই দান করেছেন গাজীনগর গ্রামের মহৎপ্রান মানুষ মরহুম হাজি ইদ্রিস উল্লাহ্ সরকার। মসজিদের জায়গা দানের পর পুকুরের কিছু জায়গা বাকী থাকলে তাঁর নাতি মরহুম হাজি ফয়জুন নূর সরকার, নাসির উদ্দিন, আমির উদ্দিন ও আল শাহরিয়ার আলমগীর মিলে মসজিদের পুকুরের জন্য দিয়ে দেন সে জায়গাও। পুকুরের চারপাশে নানা ধরণের গাছগুলো যেনও মসজিদটিকে অলঙ্করণ করেছে প্রাকৃতিকভাবে। চারদিকের খোলা পরিবেশ আর মসজিদের ভিতর সাদা টাইল্স্ সব সময়ই প্রচণ্ড গরমের মাঝেও শীতল করে রাখে মসজিদ আঙিনাকে। জানা যায়, প্রথমে হাজি ইদ্রিস উল্লাহ্ সরকারের নিজ বাড়ির সামনে তাঁরই জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো পুরোনো মসজিদ। সেখানে মুসল্লিদের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পরবর্তীতে রাস্তার পশ্চিম পাশে ৭১ শতাংশ জায়গা দান করেন তিনি। এছাড়াও মসজিদের পাশে রাস্তার পাশ ঘেঁষা গাজীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও প্রায় ১৫ শতক জায়গা দান করেন হাজি ইদ্রিস উল্লাহ। তাঁর দান করা জায়গায় গ্রামবাসীর প্রচেষ্ঠায় ১৯৫৮ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় এ মসজিদটি। আর পুরোনো মসজিদটি পরবর্তীতে মক্তব হিসেবে রেখে দেন তাঁর উত্তরসূরিরা। এ মসজিদ নির্মাণে তৎকালীন সময় সায়েখে গাজীনগরী শায়খ মাওলানা আবদুল হক, পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের প্রাক্তন ধর্মীয় শিক্ষক মাওলানা ফজলুল হক, দরগাপুরের শায়খ মাওলানা নুরুল ইসলাম খাঁন সাহেব, প্রাক্তন মেম্বার ছোরাব আলী, আবদুল বারী, প্রবীণ মুরব্বি আবদুল হান্নান, আবদুল কাদির, মো. মদরিছ আলী, মো. আজমত উল্লাহ্ ও হাজি ফয়জুন নূরসহ গ্রামের সকলেই সার্বিক সহযোগিতা করেন।
গাজীনগর জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘এই মসজিদের আগে পূর্ব দিকে আমাদের মসজিদ ছিলো, সেই মসজিদের জায়গাও হাজি ইদ্রিস্ উল্লাহ্ দিয়েছেন। সেখানে মুসল্লিদের জায়গা না হওয়ায় এখানে মসজিদ স্থানান্থন করা হয়। এই জায়গাও দান করেন হাজি ইদ্রিস উল্লাহ্। পরে আমাদের পুরো গ্রামের সর্বস্থরের মানুষের সহযোগিতায় এপর্যন্ত আমরা করেছি। বড়পুকুর, তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি নির্মাণে প্রচুর অর্থ খরচ হয়েছে। পুরো অর্থই গ্রামবাসী দিয়েছেন।’ ভূমিদাতার নাতি মো. আমির উদ্দিন ও আল শাহরিয়ার আলমগীর বলেন, ‘আমার দাদা খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি এ মসজিদের জায়গা দান করেছেন। পুকুরের কিছু জায়গা ছিলো আমরা তা পুকুরের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে দেবো। পাশে গাজীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রায় ১৫ শতক জায়গা আমার দাদা দান করেছেন।’ মসজিদের বর্তমান মুয়াজ্জিন ও ভূমিদাতার ছেলে ক্বারী মহিব উল্লাহ্ বলেন, ‘আমার বাবা নেকির উদ্দেশে এই মসজিদের ভূমি দান করেছেন। আপনারা সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। মসজিদ বানাতে গ্রামের সবাই তখন সহযোগিতা করেছেন।